ভুল

ছাগলের লাদির প্রভাবে পরিবেশ দূষণের কারণে চরকির বাণিজ্য ফেল করে গেল। স্কুলে প্রথমার্ধের পর টিফিনের সময়ে টুকটাক মশলাদার খাবার-এর বড়ই অভাব এখন! স্কুলের উল্টোদিকের দোকান-এ, মালিকের নাম আজ আর মনে পড়ে না, কাঁচের বয়াম-গুলো কি যে মনোহর দেখতে! তাদের পেটের ভিতর থেকে কি যে মধুর স্বরে বস্তুরা সব ডাকাডাকি করতে থাকত! আহা!

যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দিত কিছু ওস্তাদ গোছের ছেলেমেয়ে। কোথা থেকে তারা যেন পুরান বই-খাতা নিয়ে এসে ঐ দোকানে বেচে দিত। তাদের হাতে তখন উঠে আসত হজমিগুলি, ঝুড়িভাজা, শোনপাপড়ি, ছোলাভাজা, আরো কত কি, আর, আর সেই অসাধারণ সৃষ্টি – তেঁতুলের আচার – ও:, এখনো জিভে জল এসে যাচ্ছে (সামলে, সামলে, লালা ফেইলেন না!)

এত পুরান খাতা বই কোনখান থেকে তারা পেত কে জানে! আমার ত বই হাতে গোনা, এপাশ ওপাশ করার জো-ই নেই। উপায়! আছে, আছে। অঙ্ক বই থেকে নিয়মিত কিছু অঙ্ক বরাদ্দ হত বাড়ি থেকে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। যে খাতায় সে যুদ্ধটা চলত তাকে বলা হত ‘বাড়ির অঙ্ক খাতা’। গত সপ্তাহেই একটা বাড়ির অঙ্ক খাতা ফুরিয়েছে। জানি এই খাতাগুলো রেখে দিতে বলে মা, কিন্তু সবসময় কি সেটা মনে রাখলে চলে! দশ পয়সা দাম ঠিক হল। ব্যস! আমারো হাতে চলে আসল, ছোলাভাজা আর তেঁতুলের আচার – উল্স্ উল্স্! এমন ভাল টিফিনের দিন কতকাল আসেনি!

দ্বিতীয় অর্ধের ক্লাস শেষ করে মনের আনন্দে বাড়ি ফিরে, স্কুলের ব্যাগ নামিয়ে ফিরে দেখি মা বিছানার উপর বসে আছে স্থির মূর্তি হয়ে। সামনে পড়ে আছে খানিক্ষণ আগে বেচে দেওয়া খাতা। মানে! ছোট ছোট কয়েকটা বাক্যে মা’র কাছ থেকে বোঝা গেল কোন বাড়ির বাচ্চা আমি! আমি ছাড়া আর সবাই সেটা নাকি সবসময়-ই জানত! সেই দোকানদার ত বটেই! আমি যখন দ্বিতীয় অর্ধের ক্লাস করছি, সে সটান চলে এসেছে মা’র কাছে। এমন বাড়ির বাচ্চার এরকম বখে যাওয়া সে মোটে সহ্য করতে পারে নি। ভালমানুষের গাছ তুমি! হবে কাল তোমার! কিন্তু এখন ত মা’র পিট্টি খেতে হবে। বাবার পেটানি জানা আছে। মা’র এই প্রথম হবে। কি যে হবে কে জানে! ভুল হয়ে গেছে বড়!

আশ্চর্য ব্যাপার হল খাতা ফেরৎ আসার সংবাদটা জানানোর পর মা আর কিছু বলছে না। ওঠেও নি! শুধু নি:শব্দে কেঁদে যাচ্ছে। এক সময় আমি আর থাকতে পারলাম না। ডুকরে কেঁদে উঠলাম। মা’র দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে কেঁদে যেতে রইলাম। ক্লাস ওয়ান-এ পড়া সেই বাচ্চাটার মনের মধ্যে ঠিক কি ঝড় উঠেছিল সেটা সে ঠিকমত বুঝে উঠতে পারে নি। তার মা পেরেছিল। নেমে এসে কোলে তুলে নিয়েছিল। শান্ত করেছিল আস্তে আস্তে। পরিবার-এর আর কেউ সেই ঘটনার কথা জানে নি বহু বছর। আর সেই বাচ্চাটা এই ঘটনায় বড় হয়ে গেল অনেকটা। কোন রকম খাবার-এর লোভ করার ভুল করতে-ই তাকে আর দেখেনি কেউ কখনো – যদ্দিন না সে প্রেমে পড়ল। কিন্তু সে ত অন্য গল্প!

দিনের সবচেয়ে আনন্দের কাল ছিল স্কুল থেকে ফেরার পর বিকেলে খেলতে যাওয়ার সময়টা। তিন-চারজন বন্ধু মিলে কোথায় কোথায় যে চলে যেতাম! বারণ ছিলোনা কোনো – একটা ছাড়া। সন্ধ্যা নামার আগে ঘরে ঢুকে যেতে হবে! সেই বিকেলে একটু দূরে চলে গিয়েছিলাম। সোজা রাস্তা ধরে ফিরলে কপালে দুঃখ আছে। ধরো শর্টকাট। মাঠের মধ্য দিয়ে।

ভুলটা টের পেলাম মাঠে নেমে। খেয়াল ছিলনা যে আগের দিন বৃষ্টি হয়েছিল তুমুল। তখন আর উপায় নেই কোন, বুঝে বুঝে সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া। একেক যায়গায় থকথকে কাদায় পা ঢুকে যাচ্ছে হাঁটু পর্যন্ত। অনেকক্ষণ পর আবার যখন পাকা রাস্তায় পা দিলাম মনে হল যেন পার হয়ে এসেছি তেপান্তরের পথ। আর এই পার হওয়ার কাজটার চেয়ে বড় বীরত্বের কাজ কম লোক-ই করেছে। যত বড় হয়েছি, নুতন বন্ধুদের কাছে গল্পে এই মাঠে সেদিনের জমা কাদার গভীরতা তত বেড়ে গেছে, কারণ সবসময়-ই পা টেনে তোলার পর ফেলে আসা গর্তগুলোয় অনায়াসে আমার হাঁটু ডুবে যেত! আর মাঠটা হয়ে যেত বড়, অনেক বড়। একদিন ভুল ভেঙ্গেছে। বুঝেছি, মাঠটা ছোটই ছিল।

ছোট মাঠের মাপে আমি বড় হয়ে যাচ্ছিলাম। তারপর আবারো ভুল ভেঙ্গেছে। আমি আসলে কখন থেকে যেন ছোট হয়ে যাচ্ছি। কখন থেকে যেন সব স্বপ্নরা নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। পা ফেললে পা আবার তুলতে পারব কি? এগোতে পারব কি আর? ব্যার্থতার কাদায় ডুবেছে কতটা? হাঁটু? এর পর … বুক … মাথা?

মাঠটা আমাকে জড়িয়ে রয়েছিল অনেক দিন। কখনো, কখনো স্বপ্নের ভিতর, সেটা পার হতে পারতাম না কিছুতেই। তার আগে ঘিরে আসত নানা ভয়ংকর ছায়া ছায়া কি জানি সব। মাঝে মাঝে দেখতাম একটা শজারু এগিয়ে আসছে আমার দিকে। কেন শজারু, কোথা থেকে শজারু জানি না। শুধু দেখতাম সেটা আসছে তো আসছেই। অভিজ্ঞজনেরা বলেন যে মানুষ আসলে শজারুর জাত। কাছে আসাও চাই আবার খোঁচাখুঁচি করে এবং খেয়ে দূরেও চলে যাওয়া চাই। তবে কি আমি আমাকেই দেখতে পেতাম? কি যাচ্ছেতাই স্বপ্ন রে বাবা!

দিনের বেলা এসব সমস্যা ছিলো না। দিনের স্বপ্নে আমি মাঠটা পার হতাম পক্ষীরাজে চেপে। দিনের স্বপ্নে আমি থাকতাম দুয়োরাণীর মহলে। সে মহলটা হত খুব সুন্দর। গরীব, সাধারণ, কিন্তু খুব নিপাট করে সাজান। আর বড় রাজকুমার সেখানে বেড়ে উঠত দুনিয়ার নানা পশু-পাখীর ছদ্মবেশে। কখনো টিয়া, কখনো বাঁদর, কখনো পেঁচা, কখনো খরগোশ। বাঁদর-ই বেশী, কেন কে জানে! তারপর একদিন, বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আর থাকতে না পেরে রাজকুমারী দিত তার খোলস পুড়িয়ে। আ: এইবার সব ঠিক হতে শুরু হত। দুয়োরাণী ফিরত রাজপ্রাসাদে, আমি ফিরতাম অঙ্ক খাতায়। অঙ্ক ভুল হলে, উত্তর না মিললে, কপালে অশেষ দু:খ ঝুলছে। কিল হয়ে পিঠে পড়বে।

মানুষ করতে হবে বলে আমায় পড়াতে বসা বেচারী বাবা জানত না যে উত্তর মেলে না। অঙ্ক জানা মানুষগুলো যত অঙ্ক কষে, তত দূরে সরতে থাকে। বাবা পড়ে থাকে এক ভুবনে, অঙ্ক জানা সন্তান জীবন কাটায় আর এক ভুবনে। কী করে যে সব ভুল হয়ে যায়!

রূপকথাও বড় আজীব জিনিস – রূপের কথা, রূপোর কথা! কথা বুনে বুনে কাহিনী হয়, রাজ কাহিনী। দুয়োরাণীর ছেলে রাজা হয়ে কি করে? বন্ধুদের এনে মন্ত্রী বানায়, কোটাল বানায়, সেনাপতি বানায়। রাজপুত্রের বন্ধু হতে হবে বাবা, হুঁ হুঁ! রূপকথা নাকি বদলে যাচ্ছিল। রাজপুত্র নয়, হাজার হাজার দুয়ো মায়ের হাজার হাজার খেটে খাওয়া ছেলে-মেয়ে রাজ করবে। রাজত্ব হাতে এলে খেটে খাওয়া হাতের মুঠী নুতন শক্তি খুঁজে পায়, সাথী খুঁজে পায়, কে যে তখন কার সাথে গাঁটছড়া বাঁধে, কার কথা ভাবে! মুঠী চেপে বসে টিয়াপাখীদের গলায় যারা রাজা হয় নি, হবে না। যারা বলে বিচার চাই।

মুস্কিল এই, টিয়ারা অনেক, আর তারা কিছুতেই কথা শোনে না। হাজার মারের মুখেও তারা দাবী জানিয়ে যায় ভুল শোধরানোর।

AmitC@lohomaভুল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*