দূরবীন

মানুষ অতীতে চোখ চালিয়ে কদ্দূর পিছনে দেখতে পায়? বেশীর ভাগ ছবি-ই ফোকাসের বাইরে। তবু ডিজিটাইজ করে, পিক্সেল জুড়ে জুড়ে রেন্ডারিং করে নানা ভাঙ্গাচোরা টুকরো থেকে এক একটা ছবি বার করে আনা।

আর পাঁচটা দিনের-ই মত এক সকাল। আবার এক রকম নয়-ও। বই পড়া চলছে। বাবা এসে কোলে তুলে নিল
– চল।
– কোথায়?
– স্কুলে
বাবার কোলে চড়ে স্কুলে যাওয়ার পরে কি হয়েছিল পরিস্কার মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে একটা ছিল নীচু বেঞ্চ আর একটা উঁচু। বাবা একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে উঁচু বেঞ্চ-টার উপর বসিয়ে দিয়েছিল। ঘরে আরো অনেক বাচ্চা ছিল। তারা সব নীচু বেঞ্চে বসেছিল। জ্বর হয়েছিল বলে আমার মাথাটা সোজা রাখতে অসুবিধা হচ্ছিল। তাই কারো দিকে বিশেষ তাকাইনি। একসময় কেউ একজন সামনে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়েছিল। কতকগুলো প্রশ্ন। মনের আনন্দে প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখে গিয়েছিলাম। আর কখনো অত আনন্দে অত নিশ্চিন্তে কিছু লিখিনি। জ্বর একটু কমেছে তখন; বাবা বাড়ি ফিরেছিল কাঁধে বসিয়ে নিয়ে। ফিরে খুশীতে ফেটে পড়েছিল। মা-র কোলে আমায় তুলে দিতে দিতে জানিয়েছিল ভর্তির পরীক্ষায় প্রথম হয়েছি। হাসি আর আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল বাড়িতে। খুব ভাল লেগেছিল সেদিন। বুঝতে পারিনি যদিও, প্রথম হওয়া কাকে বলে, কি করে হতে হয়। কিন্তু ভাল লেগেছিল খুব! তার পর সারা জীবন ধরে বুঝে চলেছি প্রথম হওয়া কাকে বলে বা আরো ঠিক করে বললে – প্রথম না হওয়া কাকে বলে। সেই প্রথম-বারের পর আর প্রায় কখনোই কোন কিছুতেই প্রথম হইনি। দেশভাগের ফলে সর্বস্ব খুইয়ে, উদ্বাস্তু হয়ে চলে এসে, একটা অজানা ভূখন্ডে মাথা উঁচু করে চলার লড়াই লড়তে থাকা বাবা আমার সবসময় আশা করে গিয়েছে এইবার, এইবার তার এই প্রথম সন্তান এই পরীক্ষাটায় প্রথম হবে। আর সেই চাপে চাপে আমার সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া, সমস্ত পরীক্ষা চিরকালের মত বিষ হয়ে গেল।
কোন আনন্দ যে কি ভাবে চিরবিষাদ হয়ে যায়!

কিছু আনন্দ আবার অদ্ভুত চল ধরে। এক সময় সেটা হয়ে ওঠে লজ্জার। তার পরে সেটা হয়ে যায় একটা স্নেহের ব্যাপার। এই যেমন ছাগলের লাদির ব্যাবসা।
[ ছাগু-র নয় কিন্তু। ছাগুর লাদি নিয়া ব্যাবসা অনেক বড় ব্যাপার। সে ব্যাপারে বিশদে আমি আগে জানতামনা, যদ্দিন না চরম উদাসের “এসো নিজে করি ০৮ – কিভাবে ত্যানা প্যাঁচাবেন ” পড়ি (http://www.sachalayatan.com/udash/47904)। সে এক অছাম কান্ড- কারখানা। আমার এ গল্প সিরেফ ছাগলের লাদি নিয়ে। ] ক্লাস ওয়ান-এ পড়ি। এক বন্ধু শেখাল কি করে খাতার আয়তাকার সাদা পাতা ছিঁড়ে বর্গাকার করে নিয়ে এবার চার কোণা থেকে দুই কর্ণ বরাবর প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ফালি দিয়ে, চার ত্রিভুজ-এর (আবার! কি জ্বালা!) আলাদা হয়ে যাওয়া আট কোনার একটা ছেড়ে একটা করে পেঁচিয়ে নিয়ে এসে (পারা যায় না আর!) কাগজের মাঝখান-টায় তলা থেকে কাঠির মাথায় বাঁধা একটা তার ঢুকিয়ে এনে (আমি কোন বিশেষ ইঙ্গিত করি নাই এখানে, করি নাই, করি নাই, করি নাই) সেই তারের মাথায় ঐ চার কোনা গেঁথে দিলেই চমৎকার একটি চরকি তৈরী হয়ে যায়! মুস্কিল হল ত্রিভুজের কোনারা তারের বন্ধন থেকে বের হয়ে আসতে চায়। এইখানে এল আমার অসামান্য কারিগরী দূরদৃষ্টি। বাড়ির রোয়াকে বসে কাজ চলছিল। একটি ছাগল সামনের রাস্তায় লাদি ফেলতে ফেলতে চলে গেল। ব্যাস! আমি একটি লাদি এনে তার-এর মাথায় গেঁথে দিলাম। আমার ব্যাবসা চালু হয়ে গেল! আমায় এনে দিতে হত দুটো কাগজ। একটা দিয়ে খরিদ্দারকে চরকি বানিয়ে দিতাম, আর একটা নিজের জন্য রেখে দিতাম। যারা কাগজ আনতে পারতনা তাদেরকে আমার জমান কাগজ থেকে বানিয়ে দিতাম। বিনিময়ে চানাচুর ঝুড়িভাজা ইত্যাদি। আমার ভলান্টিয়ার বাহিনী ছাগলের লাদি কুড়িয়ে আমাদের বাড়ির ভিতরের উঠানে এনে জড় করত। এই করে আমার একটা দল-ও তৈরী হয়ে গেল। তারপর যা হয়! ব্যাবসা বেশী বড় হলে আইন রক্ষকদের নজরে পড়ে যায় – পরিবেশ দূষণের দায়ে মা আমার ব্যাবসাটা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিল। সেই যে চোট খেলাম আমার ব্যাবসা বুদ্ধিটার-ই চোদ্দ্টা বেজে গেল!

দিনে দিনে দলটা বেশ বড় হয়ে গেল। ক্লাসে মনিটর বনে গেলাম। আঃ! নেতা হওনের স্বাদ-ই আলাদা!। নেতাগিরির প্রথম পাঠেই যা বুঝার বুঝে গেলাম – ছাড় দিতে হবে। আমায় টিফিন খাওয়ালে ক্লাসে অঙ্ক-খাতার মধ্যে লুকিয়ে গল্প বই পড়া যাবে। একবার জল খেয়ে এসে পরে পরেই বাথরুম? হবে। গিয়ে ফেরার নাম নেই? ঠিকাছে। কিন্তু সেই পুরানা কিসসা। ক্রিটিকাল সাইজের থেকে বড় হয়ে গেলে নিয়ন্ত্রণ ঢিলা মেরে যায়। মনিটরী-টা গেল। সঙ্গে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি – How not to monitor your class. নেতাগিরির ঐ শেষ। তারপর থেকেই আমজনতা।

ছোটবেলায় আম খাওয়ার মজাই ছিল আলাদা।
নাঃ। সে গল্প আরেক দিন (যদি মডুরা অ্যালাউ করেন)।

AmitC@lohomaদূরবীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*