বুনো জাম (অনুবাদ)

[মূলঃ Wild Plums by Grace Stone Coates]

প্রথম কোন জাম খাওয়ার আগেই আমি দু’বার জেনে গেছিলাম জিনিসটা কি।

পয়লা বার ছিল যখন ‘পাড়ার স্কুল’-এর দিদিমণিরা এক ছুটির দিনে জাম কুড়াতে গেল; বাবা কাঁধ ঝাঁকিয়ে চুপ করে হেসেছিল। বাবা বলেছিল যে ওগুলো হচ্ছে বুনো জাম, আর বুনো জাম আকারে যেমন ছোট, খেতেও তেমনি যাচ্ছেতাই রকম বিচ্ছিরি। তারপর আমাদের শুনিয়েছিল দেশের বাইরে থাকার সময় তার নানা রকমের বাহারী ফল খাওয়ার গল্প।

বাবা মা দুজনেরই খুব অবাক লেগেছিল যে গৌরী কাকিমা আর স্কুলের বড় দিদিমণি দুজনে মিলে তপুর মার সাথে জাম কুড়োতে গিয়েছিল! কাজটা যে ঠিক হয়নি আমি জানতাম, কিন্তু কেন ঠিক হয়নি সেটা জানতাম না। সেই জন্য একবার নিজে গিয়ে বুঝে নিতে চেয়ে ছিলাম। কাকিমারা আমাদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে মাকে ডেকেছিল সঙ্গে যাওয়ার জন্য। মা তাদের বোঝাল যে আমরা বুনো জাম খাই না কিন্তু বাবা জানিয়ে দিল তার থেকেও বড় কথা – জামের বীচি খুব খারাপ জিনিষ!

তপুর মা বলল – “কি যে কন! বীচি পেটে যাইব কেন? থু থু কইরা ফালায়া দিবেন তো!” বাবা কিছু না বলে নিঃশব্দে কাঁধ ঝাঁকিয়ে একটা হাসি দিল। এই হাসি আমরা চিনি।

বাবা যাদের পছন্দ করত না তাদের সাথে কথা বলার সময় খুব বেছে বেছে সুন্দর সুন্দর শব্দ জুড়ে জুড়ে কথা বলত। মা বলত, বাবা ছোটবেলায় বাইরে বাইরে বড় হয়েছিল বলে বেশী খেয়াল করে বলা কথাগুলো অনেকসময় ও’রকম হয়ে যেত।

কাকিমারা চলে যাওয়ার পর বাবা আর মার মধ্যে কথা কাটাকাটি লেগে গেল। খুব চাপা গলায়। মা চায় না আমি এসব শুনি। তাই আমায় খেলতে বলে বাইরে পাঠিয়ে দিল। বেরিয়ে যেতে যেতে শুনলাম, মা বলছে যে এক কোণায় একা একা পড়ে থাকার চেয়ে বুনো জাম খেয়ে বীচি গেলাও ভাল!

দ্বিতীয় বার আমি এই জামের কথা জেনেছিলাম তপুদের বাড়িতে। তপুর মা জাম মাখছিল। সে বলল, ঘরময় এখানে ওখানে জাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তাই সে আমাদের সে ভিতরে ডাকতে পারছে না। তপুদের বাড়িতে কোন চেয়ার ছিল না। বড়ররা একটা টুল বা কোন বাক্স, যা হাতের কাছে পাওয়া যেত, টেনে নিয়ে বসে যেত, ছোটরা কুকুর বিড়ালদের পাশাপাশি সোজা মাটিতে। তবে, দেখবার মত একটা জিনিষ ছিল ওদের বাড়িতে। ওদের কুকুরটা। একটা অ্যালসেশিয়ান! কোথা থেকে পেয়েছিল কে জানে! আমার ইচ্ছে ছিল বাড়িটার ভিতরে ঢোকার। এর আগে আমরা কখনো ওদের বাড়ি যাইনি। এবার এসেছি তার কারণ আমার বাবা। তপুরা আমাদের থেকে একটা যন্ত্র ধার নিয়েছিল। নুতন যন্ত্র, ক্ষেতের কাজের। বাবার একদম পছন্দ ছিলনা তার যন্ত্রপাতি খোলা আকাশের নীচে পড়ে থাকে। বাড়ির বাইরে বাবা সে জন্য যন্ত্রপাতি রাখার একটা চালা-ই বানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু, যাতায়াতের পথে বাবা দেখেছিল, তপুরা কাজ শেষ করে যন্ত্রটা জমিতেই ফেলে রেখেছে! বাবা তাই ওটা ফেরৎ চাইতে এসেছিল।

আমরা যখন ওদের বাড়ি হাজির হলাম, তপুর মা দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের দিকে পিঠ ফেরানো। মোটাসোটা মহিলা, গায়ে একটা চাদর, – জায়গায় জায়গায় ফেঁসে গেছে।

তপুর বাবা বেরিয়ে এল। লম্বা লোক। বাবার সাথে ঝুঁকে পড়ে কথা বলতে রইল। তপুর মা ঘর থেকে বেরিয়ে আমাদের গাড়িটার পাশে এসে দাঁড়াল। আমাদের গাড়িতে বাবা-মা সামনের আসনে, আমি আর তোর্সা আপু পিছনে। আপু বড় বলে ওর পাগুলো ছিল অনেক লম্বা। এক সময় ও সামনে পা ছড়িয়ে দিল, লাগল গিয়ে মা’র আসনে। মা সাথে সাথে বকা লাগাল লাথালাথি থামানর জন্য। আমার পা ত ছোট, ছড়িয়ে দিয়েও বাবার আসনটা ছুঁতে পারেনি, ফলে কোন বকা খেতে হল না। রাগের চোটে আপু আমায় একটা চিমটি কেটে দিল।

আমি সাড়াশব্দ না করে, আস্তে আস্তে গাড়িটা থেকে নেমে পড়লাম। তোর্সা আপু আমায় নজরে রাখছিল। সে মা’র কাছে নালিশ করে দিল। আমি আসলে চাইছিলাম তপুর মা’র পিছনে গিয়ে দাঁড়াতে। কিছু না, একটু ভাল করে ঘুরে ঘুরে দেখে নিতাম। হল না।

মা আমায় ডেকে গাড়িতে ফিরিয়ে নিল। কিছু না জিজ্ঞেস করেই মা ঠিক ধরে ফেলত আমি কি করতে যাচ্ছি। গাড়িতে ওঠানোর সময় মা শক্ত করে আমার হাত ধরে রইল, আর ফিসফিস করে বলল “কতবার বলেছি, এ ভাবে দেখতে নেই! কি লজ্জা! কি লজ্জা!” মা বকছিল আমায়, কিন্তু তার মুখটা ফেরানো ছিল তপুর মা’র দিকে। হাসি হাসি মুখটা টানা-হ্যাঁচড়ায় মাঝে মাঝে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। আমার ইচ্ছে করছিল বুঝিয়ে বলি যে, আমি কোন গন্ডগোল করতাম না, কিন্তু শেষে আর সাহসে কুলালো না।

তপুর বাবা যন্ত্রটা দিল না। বারে বারে বলল যে সে নিজেই পরদিন এসে সক্কাল সক্কাল ও’টা ফেরৎ দিয়ে যাবে। বাবা চাইছিল এখন-ই নিয়ে আসতে। কিন্তু তপুর বাবা বলল যে সেটা সে হতে দিতে পারে না। তাদের কত অসুবিধার মধ্যে এই ধার-টা তারা পেয়েছে, তাদের কি অন্ততঃ নিজে বয়ে ফেরৎটাও দেওয়া উচিত নয়, ইত্যাদি, ইত্যাদি। সে কথা দিল কালকে নিজে তাদের পিক-আপ ট্রাক-টায় চাপিয়ে যন্ত্র-টা নিয়ে আসবে এবং আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে যাবে। কাল তারা আবার অনেক জাম আনতে যাচ্ছে, আর তাই আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে তাদের এমনিতেই যেতে হবে।

পরের দিন সকালে জলখাবারের পর বাবা, মা, আর আমি রান্নাঘরে বসে ছিলাম। তোর্সা আপু থালা কাচিয়ে নিয়ে মুরগীদের খাওয়াতে গিয়েছিল। লোক জনেরা কথা বলতে থাকলে আপু কিছুতেই চুপচাপ বসে থাকতে পারত না। কিছু না কিছু করতে করতে ঘুরে বেড়ানোটা ছিল তার সবচেয়ে পছন্দের কাজ। মা-বাবা নিজেদের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছিল আর আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। রোদের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর চোখ সরিয়ে নিলে সকালের আলোয় সারা উঠানময় নানা ঝকমকে রং-এর ঢেউ খেলে যেত। বাবা অবশ্য বলত, ঢেউগুলো আসলে খেলত আমার নিজের চোখের ভিতর, বাইরের উঠানে নয়। ফলে আমি আর বাবাকে সেগুলো ডেকে দেখাতে যেতাম না। সেদিন যখন ঢেউগুলো দেখছিলাম, একটা বেগুনী ঢেউ-এর মাঝ বরাবর গলিটা ধরে হেঁটে এল মোটকা তপু। এই ছেলেটা আমার থেকে যেমন চেহারায় বড়-সড় ছিল, তেমনি বোকামিতেও। কেউ ওকে কিছু বললে ও মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকত, কোন জবাব দিত না। তপুকে দেখে মা তাকে ভিতরে আসতে বলল। আর ও গলিটার শেষে একটা পুরান পিক-আপ ট্রাক-এর দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলল, “জাম!” তার পর দৌড়ে পালিয়ে গেল গলিটা ধরে।

মা-বাবা দুজনে রাস্তার দিকে এগোল। আমি এক দৌড়ে তাদের ছাড়িয়ে ট্রাকটার পাশে পৌঁছে গেলাম। লজঝড়ে গোদা গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে কাঠালতলীর গলির মুখটায়। সামনের আসনে চালকের জায়গায় তপুর বাবা বসে আছে, হাত স্টিয়ারিংয়ে ফেলা। অন্য দিকে তপুর মা, একটা কুচো ছানা কোলে। তাদের মধ্যিখানে বসে আছে তপুর পরের বোন রুপু। ট্রাকের পিছনে কয়েক পুরু চাদর পেতে গৌরী কাকিমা আর দুজন মহিলা যাদের আমি চিনি না। তাদের এপাশে ও পাশে গুছিয়ে বসে আছে বেশ কিছু কাচ্চা-বাচ্চা। আর হ্যাঁ, যন্ত্রটা কোথ্বাও ছিল না।

“উইঠা আসেন, উইঠা আসেন, একটু ঠেইসাঠুইসা বইসা পড়েন, হইয়া যাইব নে। আমরা সব নাজিমগড়ের পশ্চিমের পুরান বাগানটায় জাম পাড়তে যাইতে আছি। পোলাপানেরা অইখানে মনের সুখে হল্লা করতে পারবে। এমনিতেও অখন তো করবার কিছু নাই, উইঠা আসেন, উইঠা আসেন। আমরা অনেক বিছ্না-পত্তর নিয়া নিছি।”

তপুর বাবা একদৃষ্টে গাড়ির সামনের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। যখন-ই তপুর মা কথার মাঝে দম নেওয়ার জন্য থামছিল সে বলে যচ্ছিল – “বলছিলাম তোমারে এনারা কেউ যাইব না। কিন্তু তুমি ত থামবা না!” আর, তপুর মা তাকে থামিয়ে দিচ্ছিল “ফের শুরু হইল, চুপ যাবা তুমি! ”

তপুর মা যতক্ষণ আমাদের উঠে আসতে বলছিলেন, পুরো সময়টা দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। জানি না, আর কখনো কেউ এত লম্বা সময় ধরে দম বন্ধ করে থেকেছে কি না! আমার জামাটায় সুন্দর লেসের একটা কলার ছিল – সামনের দিক থেকে লাগাতে হত। সেটার ডানদিকের বোতামটা আজকে লাগাতে ভুলে গেছিলাম, তাই বাঁদিকের কাঁধ থেকে সেটা ঝুলে রয়েছিল। বুকের ধুকপুকুনির চোটে ঝুলে থাকা কলারটা এখন তিরতির করে কাঁপছিল।

ট্রাকটার পিছনের ডালাটা নামিয়ে রাখা ছিলো। সেটার ভিতর-গায়ে ওপরে ওঠার জন্য একটা ব্যবস্থা মতন আছে। আমি অপেক্ষা করছিলাম কখন মা তার পা-টা সেখানে তুলে দেবে, গাড়ির পিছনের আড্ডাটায় ‘ঠেসেঠুসে’ ঢুকে পড়ার জন্য, আর বাবা তাকে কনুইয়ের কাছে ধরে টুক করে উপরের দিকে একটু ঠেলে দেবে। সব্বাই সাথে সাথে হেসে উঠবে আর বিস্তর হৈ-হল্লা লাগিয়ে দেবে। মেয়েরা ট্রাকের পিছনে চড়ার সময় এই রকমটাই হতে দেখেছি। মাকে আমি এর আগে কখনো কোন ট্রাকের পিছনে চাপতে দেখিনি, কিন্তু জানি এই রকমটাই হবে। আমার মাথায় এ সময় অন্য আর একটা চিন্তা এসে পড়ল। বাবা তো কোন রকম হাসাহাসি কি ঠাট্টা-ইয়ারকি ছাড়াই গাড়িতে চড়ে বসবে। কিন্তু, চড়ে বসার আগে আমাকে তুলে নেওয়ার কথা কি মনে থাকবে তার? নাও থাকতে পারে। তবে ট্রাকের পিছনে বসে থাকা বাচ্চাগুলো নিশ্চয়ই আমাকে দেখতে পাবে। ওরা তখন ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়িয়ে দেবে আর আমার একটা হাত ধরে ফেলে আমাকে ঝোলাতে ঝোলাতে নিয়ে যাবে। কিন্তু তোর্সা আপু – তোর্সা আপুর কি হবে তখন?

ঠিক এইসময় বাবার গলা কানে এল, আর আমি ও চিন্তার হাত থেকে রেহাই পেলাম।

শুনলাম বাবা বলছে, “দেখেন, আপনারা যদি জামবাগানের অনেকটা ভিতরে যেতেও পারেন, যেটা না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশী, তা হলেও কিন্তু জাম যোগাড়ের কোন ঠিক-ঠিকানা নাই। এইবারের মরসুমটা শুখাই গেছে বেশী। ফলে জাম যদি জোটেও, দেখবেন সেগুলি খুব-ই কষ্টা ধরণের, মানুষের খাওয়ার উপযুক্ত নয়।”

আমার বাহারী কলার এবার মনে হয় পুরোপুরি ঝুলে গেল – নিশ্চল এক্কেবারে। হৃদয় স্তব্ধ। বাবা আবার সব পন্ড করে দিচ্ছে।

তপুর মা বলল, “ভাইজান, কিছু না হউক ভাল ভর্তা ত অইব।” তপুর বাবা এ সময় আবার বিড়বিড় করল, – “বলছিলাম না তোমারে, এনারা কেউ যাইবেন না। কিন্তু তুমি ত থামবা না!” সে এবার ট্রাক ছাড়ার উদ্যোগ নিচ্ছিলো।

আমি মা’র মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না, জানি তো কি দশা হয়েছে তার। কি করি এখন! এই সময়টা হাসি-হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে থাকা দরকার, যাতে সে ঘাবড়ে না যায়। কিন্তু অবাক কান্ড, মার মুখ দেখে মনে হোল না সেখানে কোন ভাঙ্গ্চুর হচ্ছে! কাঁচের মত মসৃণ! কিছু ধরতে পারার আগেই আমার মনটা সেখান থেকে ফস্কে গেল। “সত্যি বলছি, আজকে আপনাদের সঙ্গে যাওয়ার মত অবস্থা নেই আমাদের,” হেসে হেসে বলছিল মা, “আমাদের ডাকলেন বলে খুব ভাল লেগেছে। আশা করি খুব ভাল ভাবে বেড়াতে পারবেন আপনারা আর প্রচুর জাম ও পেয়ে যাবেন।”

কথা বলতে বলতে মা এককবার টুক করে আমার দিকে তাকিয়ে নিল। তারপর আমার কাছে ঘেঁষে এসে আমার হাতটা তুলে নিল। তপুর মা’র ও চোখ পড়ল আমার উপর। “এই পিচ্চিটা আইতে পারে না আমাগ সাথে? বাচ্চারা বাইরে খেলতে ভালবাসে।”

মা’র হাত আরও চেপে এল আমার হাতের উপর। “আমি সঙ্গে নেই, নাঃ। তা ছাড়া,” আমার লেসের কলারটার দিকে একটা সাংঘাতিক নজর চালিয়ে, “এর আজকে ঠিক-ঠাক জামা-কাপড়-ও পড়া নেই।”

“ওঃ, আমরা খাড়য়ড়ায় আছি, ও বদলায় নিকনা ওই বিয়াবাড়ির সাজ।” তপুর মা বলল নরম গলায়। কিন্তু মার মুখ লাল হয়ে গেল আর মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিল।

তপুর বাবা স্টিয়ারিঙ-য়ে হাত বোলাচ্ছিল আর মাঝে মাঝে সামনে-পাশে তাকিয়ে গাড়ি ছাড়বে-ছাড়বে করছিল। তার সর্ব্বশেষ “বলছিলাম তোমারে”-টা চাপা পড়ে গেল গাড়ির ভুড়ুম ভুড়ুম শব্দে আর সম্মিলিত বিদায়ী হল্লার নীচে। ধূলোর ঝড় তুলে রাস্তা দিয়ে ছুটে চলে গেল তাদের লজঝড়ে গোদা গাড়িটা।

বাড়িতে ফেরার পথে শক্ত মুঠোয় মা আমার হাতটা ধরে রইল। ঘরে ঢোকার পর সে ফিরল আমার দিকে। “তুই সত্যি সত্যি যেতি আজকে ওদের সাথে -” থেমে থেমে শেষ করল সে, “ওই লোকগুলোর সাথে? ”
“ওরা তো আজকে সারাটা রাত বাইরে কাটাবে,” বললাম আমি।
মা’র গলা কাঁপছিল, “তুই যেতি কি না ওদের সাথে?”
“গৌরী কাকিমা ছিল ওদের সাথে,” আমি একটা প্রতিরোধের চেষ্টা করলাম, আমি ঠিক-ই বুঝতে পারছিলাম সেই কথা গুলো – সমস্ত কথা গুলো – যেগুলো মা বলে উঠতে পারে নি।
“যেতি কি না?”
“হ্যাঁ।”
মা অনেকক্ষণ ধরে জানালা দিয়ে, মাঠ ধরে, দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর আমার মুখের মধ্যে উৎসুক হয়ে খুঁজল কিছু। “কে জানে, হয়ত তাতে ভাল ই হত,” বলল সে। “ভালই হত হয়ত,” তারপর মুখ ফিরিয়ে খাবার টেবিলটা পরিস্কার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

পরের দিন খেলছিলাম রাস্তায়। বিকেলটা বেশীরভাগ দিন-ই আমি কাটিয়ে দিতাম বুড়ো বটগাছটার নীচে বা কারখানার পিছনের খাঁড়িটার পাড় ধরে, যেখানে বড় বড় জল-ফড়িং আর নীলচে মথগুলো ঠিক নাগালের বাইরে বাইরে চক্কর খেয়ে যেত। কিন্তু এই দিনটায় আমি রাস্তাটার পাশ বরাবর খেলে যাচ্ছিলাম। মা আমায় কখনো এটা, কখনো ওটার জন্য থেকে থেকে বাড়ির মধ্যে ডেকে নিচ্ছিল। তিন বারের বার তার মুখ দেখে মনে হল যেন স্বস্তি পাচ্ছে না কোন কারণে।
অবশেষে বলে ফেলল সে, “তপুরা ফিরে এলে আবার জাম চেয়ে বোসো না যেন।”
মা জানত যদিও যে আমি চাইব না, তবু নিশ্চিত হয়ে নিতে চাইল, “দিতে চাইলেও নিও না কিন্তু।”
“কি বলব আমি?”
“বোলো, লাগবে না আমাদের।”
“জোর করে দিয়ে দ্যায় যদি?”
“না করে দেবে।”

তপুদের গাড়িটা যখন নজরে এল, মনে হল ঢিমে তালে আসছিল সেটা। পুরান গাড়ি, আর নাজিমগড় কমটা পথ না – তিরিশ কিলোমিটার, পুরো দলটাই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। আমি ভেবেছিলাম গাড়িটা পাশ দিয়ে যাবার সময় একটু গল্প করে নেব, কিন্তু আমার কাছাকাছি আসার ঠিক আগে তপুর বাবা বোধ হয় অ্যাকসিলারেটরে চাপ লাগিয়ে দিল আর গাড়িটা কেমন হঠাৎ করে হড়বড়িয়ে ছুট্টে চলে গেল।

ট্রাকের পিছনটায় বাচ্চারা আমার দিকে মুখ করে বসে ছিল। তারা হাসছিল আর হাত নাড়ছিল। তপু নীচু হয়ে একমুঠো জাম তুলে নিল। গাড়িটার মেঝে জামে ঠাসা – কম করে অর্ধেকখানা ভরে গিয়েছিল। সে একমুঠো জাম আমার দিকে ছুঁড়ে দিল; তারপর আরেক মুঠো। আমি কুড়িয়ে নিতে পারার আগেই সেগুলো ছিটিয়ে গেল পুরু ধূলোর আস্তরের উপর, ছোট ছোট গোল্লা পাকিয়ে লুকিয়ে গেল প্রায়।

জামগুলো ছিল ছোট ছোট, লাল লাল। আমার আঙুলের মধ্যে টের পাচ্ছিলাম তাদের টাটকা-গরম ছোঁয়া। আমার জামার সামনেটায় মুছে নিলাম সেগুলোকে তারপর চালান করে দিলাম জামার উপরে পড়া জ্যাকেটটার পাশ-পকেটে। লাগালাম দৌড়, গোপন রহস্যটা সামলে নেয়ার জন্য একবারটা শুধু থামলাম একটা মুহূর্তের জন্য, বুকটা লাফাচ্ছিল পাগলের মত, তারপর আবার ছুটলাম মাকে জানাতে আমার সদ্য আবিষ্কার।

মা আমায় ধরে থামিয়ে দিল, “ওরা তোমায় দেখেছে ওগুলো কুড়োতে?”
আমি পরিস্কার দেখতে পেলাম তপুটার মত দাঁড়িয়ে আছি আমি, মুখ হাঁ হয়ে ঝুলে গেছে, নড়ন চড়ন নেই। মনে মনে ছবিটা ভেবে হাসি পেয়ে গেল আমার। হাসতে রইলাম যতক্ষণ না পকেট থেকে দুটো জাম গড়িয়ে বেরিয়ে এল। “ও হ্যাঁ, ধূলোয় মাখামাখি হওয়ার আগেই আমি এগুলো তুলে নিয়েছিলাম। আর ওদের ধন্যবাদ-ও জানিয়ে দিয়েছি, অনেক চেঁচিয়ে বলেছি যাতে ওরা ঠিকমত শুনতে পায়।”

মাকে তবু খুশী দেখাচ্ছিল না। “ফেলে দাও ওগুলো,” বলে দিল সে। “তোমার দিকে রাস্তায় ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে এমন জিনিষ নিশ্চয়ই খেতে চাইবে না তুমি?”
আমার কথা আটকে গেল। আমি মার পাশে ঘেঁষে এলাম আর ফিস্ ফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, “ও গুলো রেখে দিতে পারি না আমি?”

মা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আবার ফিরে আসার আগে মনে হল অনন্ত কাল কেটে গেছে। মা আমায় তার দু’হাতে জড়িয়ে নিয়ে বলল, “কলে নিয়ে গিয়ে খুব ভাল করে জল দিয়ে ধুয়ে নাও। আস্তে আস্তে খাবে আর খোসাটা গিলে ফেলো না। বেশী খেতেও পারবে না তুমি, তেতো লাগবে, আর বুঝতে পারবে ওগুলো খাওয়ার মতো জিনিষ-ই নয়।”

আমি চুপ করে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম, আমি তো জানি কোনদিন তাকে বলে উঠতে পারব না যে, আমার জিভে লেগে আছে তাদের চমৎকার স্বাদ, সদ্য চাক ভেঙে আনা টাটকা মধুর মত, রোদের আঙ্গুলে মেশানো উত্তাপ জড়িয়ে আছে সেই স্বাদে, মিশে আছে ঝুঁকে পড়া ডালের নীচে থোকায় থোকায় জমে থাকা রসের রহস্য।

কারণ, একটা জাম আমি আসার পথেই খেয়ে নিয়েছি।

[পরিমার্জিত রূপ। সচলায়তনে প্রকাশিত মূল রূপ এখানে।]
AmitC@lohomaবুনো জাম (অনুবাদ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*