কপাল

হালের কালের পড়ুয়াকে প্রথমেই বলে নিই, এ গল্প সেই মান্ধাতার আমলের, আমাদের কালের। এ গল্প সামনা-সামনি দেখবেন তেমন কপাল করে সম্ভবতঃ আসেননি আপনারা। আর প্রবীণ পড়ুয়া, আপনাকে চুপিচুপি বলে রাখি এ গল্প একেবারেই আমার মগজের ভিতর হ’তে উৎসারিত। কোথ্বাও কারো সাথে যে কোন মিল নেই, সে আপনার থেকে বেশী আর কেউ জানে না। তবে, কপালের কথা কে বলতে পারে! সব্বাই হয়ত বলবেন আপনাদের চেনা গল্পটাই আবার চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। যাকগে, শুরু করে দিই।

কাল শেষ দিন। আজকে মেলা তাই পুরোপুরি জমে উঠেছে। নাগরদোলা, বেলুন ফাটানো, পুতুলের দোকান, চুড়ির দোকান, তেলে ভাজা। কি নেই। এমন কি মেলায় ঢোকার মুখেই হাতে হাতে পুরস্কার ধরিয়ে দেওয়া হেনা লটারীও হাজির। প্রায় সব দোকানের সামনেই ভীড়। সবার দিকে নজর দিতে গেলে আমাদের গল্প খেই হারিয়ে ফেলবে। আমরা বরং এখন বেছে নিই ঐ নীল জামা পড়া বাচ্চা ছেলেটি আর তার পাশের বাচ্চা মেয়েটিকে কে। ওদের নাম সুমন আর মিলি। বাড়ির পিছনের মাঠেই মেলা। তাই বড়দের ছাড়াই ওরা দু’জনে মিলে চলে এসেছে। বেশী রাত করা যাবে না, বাড়ি থেকে এই একটাই শর্ত। মেলার চেঁচামেচি, হট্টগোলের আওয়াজ সামলে সুমন আর মিলির সংলাপ ধরার চেষ্টা করলে যা শুনতে পাচ্ছি তা এ’রকম।
– তেলে ভাজা খাবি?
– নাঃ, বাবা রেগে যাবে। তুই ত জানিস, বাইরে ভাজাভুজি খাওয়া বাবা একদম দেখতে পারে না।
– মেসো জানতে পারবে না।
– জানবেই। আমায় ঠিক জিজ্ঞেস করবে।
– বলবি, কিছু খাই নি।
– পারব না। বলে দেব আমি।
– হাঁদা একটা!
– তুই ত বলবিই। হত তোর বাবা আমার বাবার মত, বুঝতি।
– সে আর কি করবি, যার যা কপাল।
মিলি বেশ গুছিয়ে কথা বলে। মাঝে মাঝে বোঝা যায় না ও কথা বলছে না ওর মা কথা বলছে!

ঘুরতে ঘুরতে ওরা এসে হাজির হয় হেনা লটারীর সামনে। মেলায় ঢোকার মুখে একটু দাঁড়িয়েছিল, এখন সময় নিয়ে দেখবে। এমন দোকান ওদের জীবনে এই প্রথম। দোকানটার নীচের দিকটা সব দিক থেকে ঘেরা। বাঁ দিকের ঘেরাটা কব্জা লাগানো, সেটা খুলে দোকানী ভিতরে ঢুকে একটা টুলের উপর বসে আছে। তার সামনে একটা টেবিলের মত কিছুর উপর বাঁদিকটায় হরেক কাঁচের বয়ামে কত যে কি রয়েছে! আর, ডান দিকে একটা কাঁচের বাক্স।

কাঁচের বাক্স প্রায় অর্ধেক ভর্তি কাগজের টুকরোয়। দুবার করে ভাঁজ করা কাগজ। দোকানীর ভাষায় কপাল-এর টিকিট। ভাঁজ করা টিকিটে কি লেখা আছে ভাঁজ না খুলে দেখার উপায় নেই। মাঝে মাঝে কোন বাচ্চা এসে দোকানীর হাতে লটারী খেলার মূল্য ধরে দিচ্ছে। তখন দোকানী ঐ কাঁচের বাক্সের উপরের দিকে ঢাকনা আটকানো যে গোল মুখটা আছে, সেটার ঢাকনা খুলে নিচ্ছে। বাচ্চাটা ঐ মুখ দিয়ে বাক্সের ভিতর হাত ঢুকিয়ে ভাঁজ করা টিকিটগুলো ঘাঁটাঘঁটি করে যে কোন একটা টিকিট তুলে আনছে। দোকানী ঐ কাগজের টুকরোর ভাঁজ খুলে দেখিয়ে দিচ্ছে টিকিটের ভিতর কোন সংখ্যা লেখা আছে। এরপর দু’টুকরো করে ছিঁড়ে মাটিতে ফেলে দিচ্ছে কাগজটাকে। তারপর ঐ বয়ামগুলোর থেকে বা দোকানের পিছনের দেয়ালের গায়ে রাখা তাক থেকে কাগজের টুকরোর ভিতর পাওয়া সংখ্যা মিলিয়ে বাচ্চার হাতে তুলে দিচ্ছে, দোকানীর ভাষায় ‘প্রাইজ’ – লজেন্স, বিস্কুট, হজমী-গুলি, কপালের টিপ, কাঁচের আর প্লাস্টিকের চুড়ি, ছোট খেলনা গাড়ী, কিছু না কিছু। আর তারপরেই একটা আওয়াজ ছাড়ছে – যার যা কপাল, যার যা কপাল, নিয়ে যান আপনার কপালে যা আছে। নিয়ে যান, নিয়ে যান। যার যা কপাল।

সুমন আর মিলি বেশ খানিকক্ষণ ধরে দেখল লটারী খেলা। যা দেখল তাতে মনে হ’ল, যে যাই পাক সেগুলোর দাম লটারী খেলার জন্য দেওয়া দামের থেকে বেশী হচ্ছে না। সুমনের চোখ আটকে গিয়েছিল একটা হালকা গোলাপী শার্টে। যাওয়ার-ই কথা। ঐটাই এই লটারীর সবচেয়ে দামী পুরস্কার। কাঁচের বাক্সটার পাশে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে বেশ কায়দা করে দাঁড় করিয়ে রাখা। তার পাশে দু-তিনটে চুড়ির বাক্স ও ছিল – খুব সুন্দর সুন্দর কাচের চুড়িতে ভর্তি।
– শার্টটা দেখেছিস?
– হ্যাঁ।
– ভাল না?
– ভাল, তবে আমার পছন্দ ঐ কাঁচের চুড়ি গুলো।
– আমরা পাব না।
– জানি, শার্ট-ও না, চুড়িও না। ওগুলোর টিকিট ঐ একটা কি দুটো। আর সব টিকিট গাদা গাদা।

আরো একটু সময় ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ির পথে রওনা হল ওরা। সুমন এই সময় দোকানের পিছনের অন্ধকার জায়গাটা থেকে একগুচ্ছ ছেঁড়া টিকিট মাটি থেকে কুড়িয়ে নিল। ওর মাথায় একটা মতলব দানা বাঁধছে। আন্দাজ করতে পারা যাচ্ছে কি হতে পারে। কিন্তু ঠিকমত জানার জন্য আমাদের কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ততক্ষণ বরং লটারীর দোকানের মালিক কমল আর তার বৌ হেনাকে দেখে নেওয়া যাক।

হেনা সুন্দরী। হেনার দিকে তাকালে কমলের কি যে ভাল লাগে! কিন্তু তাকানোর অবসর সব সময় কম পড়ে যায়। কমলকে দোকানে রেখে হেনা মাঝে মাঝেই মেলাটা চক্কর মারতে বেরিয়ে যায়। কমল কখনো কখনো আটকানোর চেষ্টা করে। হেনা তখন ভারী মন মাতানো একটা হাসি দিয়ে বলে – তুমি ত জানোই, যাব আর আসব। কমল কিই বা করতে পারে! হেনার সাথে সক্কলের ভাব। হেনার কারণেই মেলায় ঢোকার ঠিক মুখটায় এই দোকানটাকে বসানো গেছে। আইস্ক্রীমের দোকানের হারু আজ সকালেও গজগজ করছিল। ওর দোকানটা পড়েছে মেলার ভিতরে একটা কোণায়। এখান থেকে দেখাও যায়। কিন্তু এই ইস্পটের সাথে কোন তুলনাই হয় না। হেনা মিষ্টি করে ঝামটে উঠল
– তুমার ইস্পট কি কেউ তুমারে গলায় বেঁধে দিয়েচিল?
হারু, কমল দুজনেরই কিছু বলতে গিয়ে বলা হয় না। হেনা শাড়ির আঁচলটা কোমর থেকে আলগা করে আবার কোমরে পেঁচিয়ে নিচ্ছে। বেড়িয়ে গেল কোথায়! ফুরিয়ে যাওয়া বিড়িটা ধূলোয় ঘষে নিভিয়ে দিয়ে উঠে যাওয়ার আগে হারু চোখ টিপে কমলকে বলে গেল
– কপাল করে বৌ জুটিয়েছ বটে কমলদা!

আজ মেলার শেষ দিন। দুপুরে বাড়িতে পড়ার ঘরে বসে ছেঁড়া টিকিটগুলো ভাল করে পরীক্ষা করল সুমন। সাধারণ কাগজ। এক্কেবারে ওর অঙ্ক খাতাটার পাতাগুলোর মত। কোন ঝামেলা নেই। ভিতরে একটাই মাত্র সংখ্যা লেখা। নকল করাটা কোন সমস্যাই না। অঙ্কের খাতাটা থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে নিল সুমন। মা’র সেলাইয়ের বাক্স খুলে কাঁচিটা নিয়ে এল। চমৎকার টিকিট তৈরী হয়ে গেল। কয়েকটাই বানিয়ে ফেলল। অর্ধেক টিকিটের ভিতর লিখল – ২৫, বাকিগুলোর ভিতর ২০। কাল দেখে এসেছিল, শার্টের প্যাকেটের গায়ে লেখা ছিল ২৫ আর চুড়ির বাক্সগুলোর গায়ে ২০। টিকিটগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হওয়ার পর ভাঁজ করে ফেলল সেগুলোকে। ২৫-এর গুলোকে নিল প্যান্টের ডান পকেটে, ২০-র গুলোকে বাঁ পকেটে। জামার পকেটে নিয়ে নিল কয়েকটা ছেঁড়া টিকিট। মিলি এসে গিয়েছিল। মিলি সুমনের থেকে বছর দু’য়েকের ছোট। হলে হবে কি, চালু মেয়ে সে। ও মেয়ে সঙ্গে থাকলে সুমনের বিপদ-আপদের আশঙ্কা কম। সুমনের বাড়িতে অন্ততঃ সে’রকমই ভাবে সবাই। মিলিকে নিয়ে সুমন মেলার দিকে হাঁটা লাগিয়ে দিল।

মেলার যাওয়ার পথে একটা গাছতলায় দাঁড়িয়ে পড়ল সুমন। মিলিকে দেখাল তার বিরাট কীর্তি।
– কি সাংঘাতিক হয়েছিস তুই সুমনদা! ধরা পড়ে গেলে!
– পড়ব না। এই দেখ আসল টিকিট গুলো।
মিলিকে ছেঁড়া টিকিটগুলো দেখাল সুমন। মিলি একমত হ’ল যে সুমনের বানান টিকিট দেখতে একেবারে আসল টিকিটের মত। কিন্তু তবু ওর ভয় করতে রইল। অনেক পরামর্শের পর ঠিক হ’ল দু’জনে আলাদা আলাদা যাবে। মিলি নেবে শার্টের টিকিট, আর সুমন চুড়ির। তাহ’লে কেউ সন্দেহ করবে না। সুমন প্রথমে লটারী খেলবে। পরে মিলি যাবে। তাকিয়ে দেখল সুমন – মিলির চোখ উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছে। সুমন-এর নিজের ভিতরেও চিন্তা, উদ্বেগ, উত্তেজনা সব মিলে মিশে জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বাইরে অত্যন্ত স্বাভাবিক থাকার চেষ্টাটা ভালভাবেই করে উঠতে পারল সে। এগিয়ে গেল দোকানের দিকে। দুপুর দুপুর ফাঁকায় ফাঁকায় মিটিয়ে ফেলাই ভাল।

বাঁ হাতে টিকিটের দাম দিল। একটু মুঠো করে রাখা ডান হাতটা ঢুকিয়ে দিল কাঁচের বাক্সের ভিতর। মুঠোর ভিতর নিজের বানান টিকিট। মুঠোটা বাক্সের মধ্যে কয়েকবার নেড়ে চেড়ে বার করে আনল সে। টিকিটটা তুলে দিল দোকানীর হাতে। দোকানী টিকিটটা খুলেই স্থির হয়ে গেল। সুমনের দিকে ভাল করে তাকিয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত। তারপর টিকিটটা ছিঁড়ে ক্যাশ বাক্সের ভিতর রেখে দিয়ে কেমন একটা গলায় বলল
– আবার তোল।
– কেন? টিকিটে কত নম্বর ছিল?
– চোপ। এক থাপ্পড় মারব। আবার তুললে তোল্ , নইলে ভাগ্।
সুমনের চোখে জল এসে যাচ্ছিল। কাঁচের বাক্স থেকে হাতটা বের করার সময়ই নজরে পড়েছিল খানিকটা দূরে বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছে খাকি পোষাকের কেউ। এদিকে নকল টিকিটটা দোকানী ক্যাশবাক্সের ভিতর রেখে দিয়েছে। আতঙ্কের চোটে চোখের জল আর দানা বাঁধতে পারল না। কোন রকমে টিকিটের বাক্সের গোল মুখটার ভিতর আবার হাত ঢুকিয়ে একটা আসল টিকিট বার করে আনল সে। ঐ টিকিট মিলিয়ে পাওয়া গেল ছোট ছোট কয়েকটা বিস্কুট-এর একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের প্যাকেট। সেটা হাতে নিয়ে স্বাভাবিক থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে মেলার ভিতর ঢুকে গেল ও।

দূর থেকে সমস্তটা নজর করছিল মিলি। সেও একটু পরেই ঢুকে এল মেলার ভিতর। লটারীর দোকানটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখল দোকানী তার বৌকে একটা ছেঁড়া টিকিট দেখিয়ে চাপা গলায় কি সব বলছে। সে গরগর করছে আর বৌটা খি খি করে হাসছে। কোন রকমে পা চালিয়ে মেলার ভিতর ঢুকে গিয়ে সুমনকে খুঁজে নিল সে। বেচারী বড়ই উদাস হয়ে গেছে। তার মন ভাল করার জন্য নিজের লটারীর টিকিট না কিনে বেচে যাওয়া পয়সায় একটা আইস্ক্রীম কিনে ফেলল চটপট। কাঠির গায়ে জমানো মিষ্টি বরফ, হাল্কা সুন্দর গন্ধ। রুটি বেলার বেলনের মত কাঠিটা আইস্ক্রীমের দুপাশ থেকে একটু করে বেরিয়ে আছে, দু’দিক থেকে ধরার জন্য। দু’জনে দু’দিকের কাঠি ধরে দু’দিক থেকে আইস্ক্রীমটা খেতে থাকল, আইস্ক্রীমের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে। এই দুপুর বেলায় মেলাটা একটু ঘুম দিয়ে নিচ্ছে! এখানটা থেকে গাছপালার ফাঁক দিয়ে লটারীর দোকানটাকে দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল সুমন। মিলি বিজ্ঞের মত তাকে সান্ত্বনা দিল।
– দুঃখ করিসনা সুমনদা। তোর কপালে ছিল না, কি করবি বল।

অনেক গল্প এখানেই শেষ হয়ে যায় কিন্তু আজকেরটা আর একটু এগোতে ইচ্ছে করছে। সুমন যখন কমল-এর ধমক খেল, মিলি একাই কেবল সেটা নজর করেছে, ব্যাপারটা তেমন নয়। একটু দূরে খৈনী ডলতে থাকা লাঠিধারী হরিশ প্রসাদেরও সেটা নজরে পড়েছিল। মফস্বল শহরের এই মেলায় রাতের বেলায় দু’জন লাঠিধারী পাহারায় থাকলেও দিনের বেলায় মেলাটা একজনর হাতেই থাকে। এরা কোন থানার লোক না। তা বলে দাপট কিছু কম নয়। খাস মেলা কর্তৃপক্ষের বসানো গার্ড। তবে বেতন সামান্যই। সেটা নানাভাবে পুষিয়ে নিতে লাগে, কি আর করা যাবে!

বাচ্চা ছেলেটা দোকান ছেড়ে মেলার ভিতরে ঢুকে যেতেই হরিশ খৈনীটাকে মুখের ভিতর চালান করে দিয়ে ধীরে সুস্থে লটারীর দোকানের দিকে পা বাড়াল। ওকে আসতে দেখেই হেনা দোকানের ভিতর থেকে বের হয়ে এসে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। হরিশ এসে হেনার পাশে বিপজ্জনক নৈকট্যে সেঁটে গিয়ে জিজ্ঞেস করল
– চীটিং কিয়া তু নে?
হরিশ বাংলা বলে যে কারো মতনই। কিন্তু এই সব সময়ে বাংলা ছেড়ে অন্য কিছু বললেই কেসটা আরো টাইট হয় বলে হরিশের বিশ্বাস।
– কি যে বলেন গার্ডদাদা, আমার এখানে কোনরকম চিটীং-এর কাজ-কারবার নেই। । আমার সব কাজ এক নম্বরী।
– নিকাল।
– কি? কি বার করব?
হরিশপ্রসাদ তার হাতের ডান্ডাটি ক্যাশবাক্সের উপর ঠুকে বলল
– উও টিকট নিকাল।
কমল ভয়ে ভয়ে টিকিটটা বার করে দিল। হরিশপ্রসাদ পড়ল,
– বিশ নাম্বার! কৌন চীজ বে?
হেনা হরিশ-এর গায়ের উপর ভর দিয়ে হাত বাড়িয়ে চুড়ির বাক্সগুলোর থেকে একটা তুলে নিয়ে হরিশপ্রসাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল
– এইটা আপনিই নিন, দাদা।
– কেয়া?
হেনা এর মধ্যে একটু সরে গিয়েছিল। বেশী না, একটু। মধুর হেসে বলল,
– বাড়ি, বাড়ির জন্য, বৌদিকে দেবেন।
হরিশ একবার হাতের চুড়ির দিকে তাকাল, একবার দোকানীর বৌটার দিকে। শালী দাদা ডাকে! এ চোরচোট্টা লোকের এই রকম বৌ জোটে কি করে? কপাল বটে!

চুড়ির বাক্স হাতে ধরে রেখেই জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যায় হরিশ প্রসাদ। হেনা আবার সরে এসেছে। হরিশ কথার মাঝে মাঝে এপাশ ওপাশ করে। কমল বলতে থাকে যে বাচ্চা ছেলেটা বদমাশের একশেষ। নকল টিকিট নিয়ে এসেছিল। কিন্তু কি ভাবে সে বুঝল যে সেটা নকল, তার সঠিক কোন উত্তর সে দিতে পারে না। হরিশের সন্দেহ হয় দামী জিনিষগুলো আসলে খদ্দের ধরবার জন্য, কিন্তু টিকিট নেই তাদের। এই নিয়ে কতটা চাপ দেওয়া যায় সেটা ঠিক করতে করতে আর অন্য একটা চাপের আমেজ নিতে নিতে একসময় সে এখনকার মত দান ছেড়ে দেয়। কমল-এর বাড়িয়ে রাখা টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে নিতে নিতে ওদের সতর্ক করে দেয় যে তাকে না জানিয়ে এরা যেন মেলা ছেড়ে চলে না যায়।
– বিনা বাতাকে ভাগনা মাত্।
তারপর প্রায় গলার ভিতর রেখে হেনার কানে ছেড়ে দেয়,
– রাতে আসব।
যাওয়ার সময় লাঠির ডগায় হেনার শাড়ির মাঝে একটা কুশলী টোকা দিয়ে যায়। মনটা খুশী খুশী লাগছে হরিশের। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, বৌ কাল মেলায় আসতে পারেনি। সকালে হরিশ বেরিয়ে আসার সময় পিছন থেকে বলেছিল আজ আসবে, অনেক ঘুরবে। কত বার বলেছে হরিশ, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় পিছন থেকে ডেকে কিছু না বলতে। মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল হরিশ প্রসাদের – কি যে আছে আজ কপালে কে জানে!

হরিশ চলে যেতেই কমল ফেটে পড়ে হেনার উপর। এই লটারীর বাক্স নিয়ে ঘুরে বেড়াতে তার আর ভাল লাগে না। কেউ কিনতে আসে না টিকিট। এই চুড়ির বাক্স, শার্ট এ’সব ধারের জিনিষ দিয়ে এই ঝুটা ব্যবসা শুধু হেনার জেদে চালিয়ে যেতে হচ্ছে। আইস্ক্রীমওয়ালা হারু কেন ধার দিয়েছে এসব সে কি জানে না! ভাল করে জানে। কিন্তু কিছু করার নেই।
– কপাল, সব আমার ফাটা কপাল!

হেনা চুপচাপ শুনে যায় শূন্য চোখে। জল অনেকদিন শুকিয়ে গেছে। হারু কোনদিন ওর বৌকে ছেড়ে দেবে না। হারুর শ্বশুর বড়লোকের বাড়ির ডেরাইভার। হারুকেও বলেছে লাইনে নিয়ে নেবে। হারু কমলকে ধার দেবে, হেনার থেকে যেমন পারবে সে ধার শোধ নেবে, কিন্তু কোনদিন হেনাকে নিয়ে এ জীবন থেকে অন্য কোন জীবনে চলে যাবে না। তবে কিনা, ভাবনা বড় বিচিত্র! হারু বলেছে, সামনের মাসেই একটা গাড়ির কাজ পাওয়ার কথা আছে। গাড়ি পেলে মাঝে মাঝে কি আর হারু হেনাকেও টুক করে এখানে ওখানে ঘুরিয়ে আনবে না! হাসি ভেসে এল হেনার ঠোঁটে। কপালটা মনে হচ্ছে একেবারে খারাপ না। শুধু ঘরের লোকটা বেশী চেতে না যায় সে’টা খেয়াল রাখতে হবে।
– ঝাঁপ ফেলে দাও, এখন আর কোন খদ্দের আসবে না।
একটা বিচিত্র গা ঝাড়া দিয়ে কমলকে একটু ঠেলে সরিয়ে দোকানের পিছন দিকে চলে যায় ও। হেনা মুখ খুলতেই কমল চুপ করে গিয়েছিল। এখন ঠেলা খেয়ে ভিতরটা চলকে উঠল। কপালটা মনে হচ্ছে আজ ভালই!

সুমন অনেকক্ষন একাই আইস্ক্রীম চুষছিল। মিলি নজর রেখেছিল হরিশের উপর। একটু ভয় ভয় করছিল, দোকানী কি বলে, গার্ডটাকে ওদের খোঁজে পাঠায় কি না! খাকি পোষাকটাকে মেলার ভিতরে ঢুকতে দেখলেই বেড়ার ফুটো দিয়ে সুমনকে নিয়ে বের হয়ে যেতে হবে। বাড়ির পিছনেই মেলার এই মাঠটা মিলি ভালই চেনে। কিন্তু দেখল, গার্ডটা দোকানীর থেকে টাকা নিয়ে দোকানীর বৌটার পায়ে না কোমরে লাঠির বাড়ি মেরে রাস্তার দিকে চলে গেল। খিলখিল করে হেসে উঠে মিলি সুমনের হাত ধরে টান মেরে বলল
– সুমনদা, বেঁচে গেছিস! তোর কপালটা আজ ভালো। চল্ , এবারে বাড়ি যাই। ও বেলা আবার আসব।

AmitC@lohomaকপাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*